Home MIRROR EDITORIAL এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র তাকে হত্যা করল!

এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র তাকে হত্যা করল!

4
0

          পারসিকিউটেড প্রিজনারস সলিডারিটি কমিটি (পিপিএসসি) র প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যতম জাতীয় আহ্বায়ক,

আদিবাসী অধিকার আন্দোলন, বিস্হাপন বিরোধী আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃত্ব ফাদার স্ট্যান স্বামী সোমবার

দুপুরে মুম্বই এর এক হাসপাতালে রাষ্ট্রীয় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বন্দী থাকাকালীন অবস্থায় মারা গেলেন।

খুব সহজ ভাষায় বললে, এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র তাকে হত্যা করল।

– লিখছেন  অমিতাভ সিংহ 

 

 

দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে ঝাড়খন্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার

আন্দোলনে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে ফাদার স্ট্যান অনুভব করেছিলেন, প্রায় প্রত্যেক আদিবাসী পরিবারেরই

কোন না কোন সদস্য রাষ্ট্র দ্বারা মিথ্যা মামলায় হেনস্থার স্বীকার হচ্ছেন। প্রায় হাজারের কাছাকাছি

আদিবাসী মানুষ কার্যত বিনা বিচারে রাষ্ট্রীয় বিচারবিভাগীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বছরের পর বছর জেলে পড়ে রয়েছেন।

সেখান থেকেই উদ্যোগ শুরু হয় এই নিপীড়িত বন্দীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলার।

২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে যাত্রা শুরু হয় পিপিএসসি র।

প্রথম কাজ হিসেবে ঝাড়খন্ডে জেলবন্দী ১০০ জন আদিবাসী বন্দীর ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়,

সেই সমীক্ষার রিপোর্টে উঠে আসে যে শতকরা ৯৬ ভাগ মানুষকে সম্পূর্ণ বিনা কোন অপরাধে এবং কারণে

জেলবন্দী করে রাখা হয়েছে। এই সমীক্ষা রিপোর্টটি হিন্দি এবং ইংরাজীতে বাগাইচা র পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই সমীক্ষা রিপোর্ট শোরগোল ফেলে দেয়।

তারপর চাইবাসা জেল কে মডেল করে দমনমূলক আইনে বন্দী সমস্ত বন্দীর মামলার ডিটেইলস

যোগাড় করার কাজ শুরু হয় এবং সাথে সাথে যাদের যাদের সম্ভব, আইনজীবী নিয়োগ,

বেলবন্ড জমা করা, বিচারের তদারকির কাজ চলতে থাকে। আর টি আই করে,

ঝাড়খণ্ড স্টেট লিগাল সার্ভিসেস অথরিটির সাথে সাক্ষাৎ করে, আইন কলেজের ছাত্র দের ইন্টার্ন

হিসেবে নিয়োগ করে ডেটা কালেকশনের কাজ চলে। চাইবাসা জেলের মোটামুটি একটা তালিকা

তৈরি হবার পর ফাদার স্ট্যান গোটা ঝাড়খন্ডে কত জন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ

এই ধরনের দমনমূলক আইনে আটক রয়েছেন, তা জানার জন্য চেষ্টা শুরু করেন।

রাজ্য প্রশাসন তাকে তথ্য দিতে অস্বীকার করে।

তখন এই মর্মে ফাদার স্ট্যান এর পক্ষ থেকে রাঁচি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশে বন্দীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা রাজ্য সরকার ফাদার স্ট্যান কে দিতে বাধ্য হয়।

তারপর থেকেই নানা ভাবে তাকে হেনস্থা করা শুরু হয়। তাকে পাথালগাড়ির আন্দোলনের

পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

ইতিমধ্যে রাঁচি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলার শুনানি শুরু হবার কথা ছিল, যে কেন এই মানুষেরা

বিচারাধীন অবস্হায় এতদিন ধরে জেলে রয়েছেন, স্টেট এর তরফ থেকে কি কি ফল্ট রয়েছে ইত্যাদি নিয়ে।

কিন্তু রাজ্য সরকার বারবার সময় নিতে থাকে, মামলার শুনানি পিছাতে থাকে।

তারপর শুরু হয় ভীমা কোরেগাঁও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ফাদার স্ট্যান কে এন আই এ দ্বারা জেরার পর্ব,

বিভিন্ন কল্পিত বিষয় নিয়ে বারবার তার অফিসে এন আই এ হানা দিতে থাকে,

শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়।

তাকে গ্রেফতার করার সময় তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া যায় একটি লোহার খাট এবং একটি টেবিল,

সেটিও এন আই এ সিজ করে। বারবার তার জামিনের আবেদন খারিজ করে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

যে রাষ্ট্রীয় বিচারবিভাগীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন ফাদার স্ট্যান,

সেই রাষ্ট্রীয় বিচারবিভাগীয় সন্ত্রাসের দ্বারাই তিনি খুন হলেন।

পিপিএসসি একটি স্বাধীন সংগঠন ছিল।

কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তার কোন ধরনের সংস্রব ছিল না।

এটা রাষ্ট্র জানে না, এমনটা নয়। তারপরও যারা যারা পিপিএসসি গঠনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিলেন,

তাদের ওপর চরম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে, একজন যাবজ্জীবন সাজা খাটছেন,

একজন আজ দুবছরের বেশি সময় যাবৎ বিনা বিচারে বন্দী, একজন দেশছাড়া, আর ফাদার স্ট্যানকে তো হত্যাই করা হল।

সংগঠনগত ভাবে পিপিএসসি কে বিনা কোন তথ্য প্রমাণে দাগিয়ে দেওয়া হল

একটি রাজনৈতিক দলের ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন হিসেবে।

কারণ একটাই ফাদার স্ট্যান, সুধা ভরদ্বাজ, প্রশান্ত রাহী, পার্থ সারথি রায়, JAGLAG (Jagdalpur Legal Aid Group) এবং

পিপিএসসি এরা প্রত্যেকেই নিপীড়িত আদিবাসী জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে এই শোষণমূলক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্হার বিরোধিতা

করেছিল। ফলস্বরূপ মাত্র ৫ বছরের মধ্যে রাষ্ট্র পিপিএসসি র অস্তিত্বকেই ধ্বংস করে দিল।

কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা অত্যাচার শেষ কথা বলে না, শেষ কথা বলে জনগণ।

ভারতবর্ষের শোষিত নিপীড়িত জনগণ ফাদার স্ট্যান এর মত একজন মানবদরদী দেশপ্রেমিক সমাজসচেতন মানুষের হত্যার

জবাব নিশ্চিতভাবেই দেবে এবং এক শোষণ নিপীড়ন মুক্ত ভারত গড়ে তুলে ফাদার স্ট্যান সহ গণতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনের

সমস্ত শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবে।

ফাদার স্ট্যান স্বামী অমর রহে।

Previous articleদেশ জুড়ে ভূমিকম্প
Next articleঅপ্রতিরুদ্ধ ইতালি। প্রতিপক্ষ স্পেন