Home FEATURE অনুরাগের নাম ছিল মধুবালা !

অনুরাগের নাম ছিল মধুবালা !

11
0

দিলিপসাবের গত জন্মদিনটাও ছিল সায়রার জীবনের সবচাইতে বড় উৎসব। লকডাউনে মুম্বইয়ের বিধিনিষেধের বেড়াজাল  সত্ত্বেও

৯৮ পেরনো মহানায়কের অর্ধেক আকাশ ঝলমল করছিল আলোয়। এক বিরাট শিশুর ক্লান্ত ও প্রশান্ত মুখে আনন্দের একটা ঝলক  দেখতে

তাঁর অর্ধেক শতকের সঙ্গিনী রঙ্গিনী রঙ্গমঞ্চ জুড়ে থেকেছেন অবিরত স্রোতস্বিনী। এত প্রেম যেন কখনও দেখিনি।  আর দুটো রান হলনা।

দিলিপ কুমারের নৌকো পরপারে পাড়ি দিল। সাড়ে আটানব্বই। এতটা সময় ক্রিজে থেকেছেন  রীল ও রিয়াল লাইফ একাকার করে।

দুজনেই দুজনের মত স্পিন, পেস ছাতু করে দাপটে স্বপ্নের ঝুলি ভরেছেন।

 

     – দিলীপসাবের সঙ্গে কাটানো হাতে গোনা কয়েকটা ঘন্টা নিয়েই কলম ধরলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবারুণ রায়  

টিকে থাকার জন্য খেলেননি। খেলেছেন, ফেলেছেন, দিয়েছেন, পেয়েছেন , এবং অবিরাম চলেছেন। কখনও থেমে যাননি।

যখন রূপোলি মায়ার জগৎ ছেড়েছেন তখনও তা আসলে সামাজিকভাবে মানবিকভাবে সাহসিক সচেতন মানুষের পাশে থাকতে।

সিনেমা থেকে রাজনীতির গলিতে ঢুকে গোলকধাঁধায় আলোআঁধারিতে পথ হারিয়ে ফেলেননি।  রাজপথের রাজনীতিতে কণ্ঠ ছেড়েছেন,

ইমান ছাড়েননি। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকেছেন,  কিছু পাওয়ার জন্যে বা পাওয়ারের কাছে থেকে

পাওয়ার ফুল হওয়ার জন্যে নয়। সাম্প্রদায়িক, প্রাদেশিকতার  বিষবাষ্প বলিউডের উদার আকাশে ধূমকেতু হয়ে

এলেও তার বিরুদ্ধে প্রতীকী তোপ হয়ে উঠেছেন।

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আগলে রেখেছেন ফিল্মিদুনিয়ার কম্পোজিট কালচার। তাঁর চলে যাওয়ার সকাল বলছে

অন্তবিহীন এই মহাজীবন।  কিন্তু বড় শূন্য শূন্য দিন। জীবনে একবারই তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় পেয়েছি। আমি তো দেখেছি

কলকাতার উত্তম জীবন থেকে শুরু শেষের কবিতার ধূসর পাণ্ডুলিপি। আর ছিল স্বপ্নে দেখা আনারকলির কলিটুকু।

“প্যার কিয়া কোই চোরি নহী কী, ছুপ ছুপ কে আহে ভরনা ক্যা, জব প্যার কিয়া তো ডরনা ক্যা …..।”

সেলিমের কস্টিউম তো যুবরাজের। কিন্তু সবাইকে কাঁদিয়ে বক্স অফিসের চৌকাঠ ভেঙে দিয়েছিল এক প্রেমের তুফান তোলা

অতি সাধারণ কিশোর প্রেমিকের চোখের সজল ভাষা। যুবরাজের কস্টিউম নয়, আম যুবকের কষ্ট সেদিন সেই তুফানি প্রেমিকের

ফ্যান ফলোয়িং বাড়িয়েছিল রাতারাতি। বাংলার আকাশসীমা লঙ্ঘন করল সেই নায়কের অরূপ বৈভব যেদিন দেখা হল সাগিনা মাহাতর সঙ্গে।

তার পরের লম্বা ইতিহাসের সঙ্গে আজকের দৃশ্যে পুনরাবৃত্তির কোনও সিন নেই। আজ শুধু স্মৃতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাল ২০০৭,

কাল অপরাহ্ন থেকে সন্ধ্যা। স্থান রাজধানীর অশোক হোটেলের ছ’তলা।

অফিসের এই অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করার অনুষ্ঠান তো কাল হয়ে গেছে।

তবু কোথায় যেন চাড় ছিল।  দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত সেই   মহানায়কের কাছে এই চাড়েই হাজির হয়েছিলাম।

একে চন্দ্র দিলিপকুমার আর তিনে নেত্র সৌমিত্র ।  খবর নিয়ে জানলাম, দিলিপসাব মুম্বই ফিরবেন রাতের ফ্লাইটে।

সেদিন হোটেলেই থাকবেন সকাল থেকে। পুরস্কার পাওয়ার পরদিন দিল্লির বন্ধুদের   জন্যে রেখেছেন সকালটা।

সুতরাং একটা চান্স নেওয়া যাক ভেবে সরকারি পাঁচতারার ছ’তলায় সটান চলে যাই। করিডরে আর্দালিকে জিজ্ঞেস করি ,

ভিভিআইপি স্যুট কোনটা। না কোনও টেনশন তেমন নেই। কারণ এতবড় বলিউড তারকা , তায় বিশেষ সেলিব্রিটি ও ভারত সরকারের অতিথি,

বিনা অ্যাপোয় দেখা করবেন না এতো জানা কথা। তবুও একটা চান্স নেওয়া। যদি শিকে ছেঁড়ে। এবং বিশাল দরজার কলিংবেল টেপার আগে মৃদু চাপ

দিতেই সত্যিই অবিশ্বাস্য ভাবে খুলে গেল একটি ভারি কপাট, যেটিকে নির্ঘাত বুলন্দ দরওয়াজা বলে মনে হয়েছিল।

আরও অবিশ্বাস্য ভাবে দেখছি , বিশাল বৈঠকখানায় শেষ প্রান্তে সোফায় বসে আমার মতো রিপোর্টারদের সেই বিকেলের ঈশ্বর।

কাগজ পড়ছেন, কিন্তু মুখ ঢাকা নেই কাগজে। স্বচ্ছ মানুষ যেমন, তেমনি স্বচ্ছ পোশাক।

সাদা মলমলের কুর্তা আর সাদা পাজামা। মেজাজের বেশ একটা মৌতাতে আছেন এই নিমগ্ন লগ্নে।

অস্বস্তি হল সেই বিকেলের একলা থাকার মগ্ন মুহূর্তটি ভাঙতে। কিন্তু তখন ভগ্নদূত না হলে , পরম লগন চলে যায়।

তাই, মে আই কাম ইন স্যার ! টেবিলে কোনও বেল নেই ওঁর। হামেহাল হাজির নেই কোনও বেয়াড়া।

উনি কাগজ থেকে মুখ তুলে বললেন, ইয়েস। প্লিজ কাম ইন। ঢুকে ওঁর কাছে গিয়ে অভিনন্দন, তাও খালি হাতে,

জানিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আপনাকে দেখতে এসেছি। সেই সুযোগে যদি একটু সময় দেন তাহলে কথা বলব।

সাধুর মত আনন্দময় স্মিত হাস্যমুখ ও চোখে আলো ছড়িয়ে উনি বললেন, আরে বসো বসো তো। নিশ্চয়ই।

কী বলতে চাও বলো। বলেই মৃদু কণ্ঠে ডাকলেন, সায়রা শুনছ তো ! এখানে এসে বস।” হাঁ জি “, উত্তর শুনতে না শুনতেই পর্দায় স্পন্দন।

সেকালের স্বপনচারিণীকে দেখছি ঘুম জড়ানো চোখে ওঁর পাশে বসলেন। ” কীহল বল।

আজ ঠিকমতো শুতেও পারিনি। ” তাঁর মানুষটি বললেন, এই দেখ উনি এসেছেন , আমি একটু কথা বলব ওর সঙ্গে।

এখন যেন কেউ না আসে। আর আমাদের জন্যে চায়ের ব্যবস্থা করে দাও। এবার আমাকে বললেন, ইনি আমার ধর্মপত্নী।

সায়রা বানুকে নমস্কার ও তাঁর প্রতি-নমস্কার । পনের মিনিট বলে শুরু করেছি। কিন্তু দেড় ঘণ্টা পরেও তিনি থামতে বলেননি।

শুধু তো সিনেমা নয়, দেশের মা ও মানুষের কথাও। কোনও বিরক্তি, অস্বস্তি, রাখঢাক বা অতিকথন নেই।

এত আমিহীন, আজ ও আগামীকাল কথা স্বতন্ত্র স্বতোৎসারিত প্রাঞ্জল উঠে আসছে তার মুখে।

কিন্তু খুব ধীরে, শান্ত স্বরে পরিশীলন ও পরিমিতির ক্লাস নিচ্ছেন যেন।

কিন্তু পাঠকের পেট ভরে না ঐটুকু তে। আমি যত ভাবি মধূর তোমার শেষ যে না পাই , ততই মনের মধ্যে প্রহর শেষের ঘন্টা বাজে।

মনে মনে ঠিক করে নিতে পারি, হক কথা সবশেষে। যখন বিরক্ত হলেও এই আয়োজন পণ্ড হবেনা।

যেকথা কখনও কাউকেই বলেননি। তার কারণও ব্যাখ্যা করেননি।

বুকের ভেতরে রেখে দিয়েছেন আলিবাবার গুহার মতো ভালবাসা আর বেদনার কত শত রত্নমালা মণিহার।

অনেক সেধে নিয়ে বলি, আপনি কখনও বলতে চাননি। কিন্তু সবাই জানত চায় আপনার মুখ থেকে।

আপনার গিন্নি সহ যে যে যুগান্তকারী অভিনেত্রীরা আপনার নায়িকা হয়েছেন তাঁদের মধ্যে অভিনয় প্রতিভায়

কেউ কি আপনাকে অতিক্রম করে যেতেন ?
দিলিপসাব একটু চুপ করে থেকে ভাবলেন। কিন্তু রীতিমতো তৈরি তাঁর সরগম।বললেন,আমার চেয়ে অনেকটাই

এগিয়ে রয়েছে অনেকেই। তাই আমি ওঁদের নম্বর দিতে পারিনা। কাকে ছেড়ে কার কথা বলব।

সবাই আমার ভীষণ প্রিয় ভীষণ দক্ষ, ভীষণ যোগ্য ও অনুসরণের মতো। আর, শেষ বিচারে বসে কাউকে দুঃখ দেবনা।

তাই তোমার এই প্রশ্নের উত্তর হলনা। শেষ বিচারের ভার আমার নয়।

তুমি আমাকে বিচারক ভাবলেও আমি তো নিজেই পাদপ্রদীপের ভরসায়।

সায়রা পাশে বসে বেশিটাই শুনেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর মুখের অস্তরাগের আভা। না, একদম কোনও রাগ নেই।

মনে পড়ে দিলিপ যখন মধ্যগগনে তখন তাঁর চোখে অনুরাগের নাম ছিল মধুবালা।

এসেছেন মীনাকুমারি, নার্গিস এমনকি ওয়াহিদা। দিলিপ ভালবেসেছিলেন আনারকলিকে।

কিন্তু গোঁড়া পরিবারের প্রশ্ন ছিল তাঁর জন্মসূত্র নিয়ে। তার অনেক পরে সায়রা।

একঝলক তাকিয়ে সায়রার দিকে, দিলিপসাব বলেন, আরে ম্যাডাম, তুমি চা আনতে বল।

সায়রা ফোনের কাছে ছুটে যান। আর ফিরে আসতেই দিলিপসাব আমার ইচ্ছাপূরণের জন্য

সায়রাকে বলেন, এই ব্রাদারের আর আমার একটা ছবি তুলে দাও। হেঁসে দাঁড়ান আমার সঙ্গে, সামনে সকালের ফুলদানি।

এবার আমি বলি, আপনি বসুন এবার। আমি আপনার একটা ছবি নেব। শিশুর মতো সাবলীল হেসে বসেন।

কিন্তু শেষ নোটে একটাই ফাঁক ছিল সেই সন্ধ্যায়। ফুলের ব্যাক আপে নায়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সায়রাবানু।

ওঁর মুখ ছিল আউট অফ ফোকাসে।

Previous articleঅদম্য মনোবলে বাধা পেরোলেন মেসিরা
Next articleজম্মু-কাশ্মীরে মৃত ৫ সন্ত্রাসবাদী